সর্বশেষ খবর :
মুজিববর্ষ

» চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের করোনাভাইরাস আতঙ্কে বাণিজ্যে সঙ্কটের আশঙ্কা

প্রকাশিত: ০৯. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | রবিবার

করোনা ভাইরাস চীন থেকে এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যু সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও অন্তত ৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩৬ জনে। একইসঙ্গে বেড়েছে আক্রান্ত সংখ্যাও।

২৪ ঘণ্টায় নতুন তিন হাজার ১৪৩ জন নিয়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ১৬১ জনে। এর মধ্যে চার হাজার ৮০০ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছে বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।

দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের বরাত দিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, করোনাভাইরাসে মৃত্যু বেড়ে ৬৩৬ জন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হুবেই শহরেই মারা গেছেন ৬১৮ জন। এছাড়া গতকাল সকাল পর্যন্ত নতুন আক্রান্ত সংখ্যা বেড়েছে তিন হাজার ১৪৩ জন।

বর্তমানে গোটা বিশ্বে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে নভেল করোনাভাইরাস। এই রোগের শুরু চীনে। দেশটির মধ্যাঞ্চলের প্রাদেশিক রাজধানী শহর উহানে এর আবিষ্কার। এরপরই মহামারী আকার ধারণ করে দেশটিতে। এছাড়া রোগটি এখন ছড়িয়ে গেছে বিশ্বের ২৪ টিরও বেশি দেশে।

এরফলে গোটা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও আতঙ্ক বাড়ছে। সরকারের প্রস্তুতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে সচেতনতা। বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরে স্ক্রীনিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। অবিলম্বে চীনের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ করার জোর দাবি উঠেছে।

সতর্ক নাগরিকদের বিপুল চাহিদার কারণে বাজারে দেখা দিয়েছে মাস্ক সঙ্কট। যাও কিছু পাওয়া যাচ্ছে বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। সরকারের রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া নানারকম তথ্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহবান জানানো হয়েছে। গত ১৭ দিনে চীন থেকে ফিরেছে ৭ হাজার ৩৩১ জন।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নানা সঙ্কটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের চলমান মেগা প্রকল্পগুলোতেও এর প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসা ও উন্নয়নসহযোগী দেশ চীন।

বিপুলসংখ্যক লোক প্রতিদিন দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করছেন। আমদানি- রফতানি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পণ্য।

বিশ্বের অনেক দেশ চীনের সঙ্গে তাদের সকল ফ্লাইট স্থগিত করেছে। বাংলাদেশ সরকারকেও দ্রুত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে বিপুল যোগাযোগের বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।

চীনে কোনো বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়নি
চীনে থাকা কোনো বাংলাদেশি নাগরিক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হননি। এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থান করা চীনা নাগরিকরাও ভাইরাসটির আক্রমণ থেকে মুক্ত রয়েছেন। এমনটাই জানিয়েছেন- ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। গত বৃহস্পতিবার উহান ভাইরাস নিয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরেন।

কোনো ধরনের গুজবে কান না দিতে বাংলাদেশিদের প্রতি আহবান  জানিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষকে সতর্ক হতে দিন, তবে আতঙ্ক সৃষ্টি করবেন না। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে মিশনের উপপ্রধান হৌলং ইয়ান উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেন, চীনা দূতাবাসের কেউ এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে কাজ করা কোনো চীনা নাগরিক করোনাভাইরাসের শিকার হননি।

এ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো ‘বেশি প্রতিক্রিয়া’ দেখাচ্ছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত চীনসহ ২৫ দেশে নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। মোট রোগীর ৯৯ শতাংশের বেশি চীনে ভাইরাসটির শিকার হয়েছেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে সমস্যা 
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর পদ্মা সেতু প্রকল্পের যেসব চীনা কর্মী দেশে গেছেন, তাদের ছুটি প্রলম্বিত হলে প্রকল্পের অগ্রগতিতে সমস্যা হতে পারে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে উড়াল সড়ক, বাস, র‌্যাপিড ট্রানজিট ও মেট্রোরেল প্রকল্পে চীনা নাগরিকরা কর্মরত এবং করোনা ভাইরাস এসব প্রকল্পের অগ্রগতিতে কোন প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

যদি আগামী দুই মাসের মধ্যে এই অচলাবস্থার (করোনা ভাইরাস) অবসান হয় তাহলে আমাদের কোন অসুবিধা নেই। আমাদের কাজ চলতে থাকবে। বাইরে থাকা চীনাদের ছুটি দুই মাসের বেশি হলে সমস্যা হবে কিনা এবং বিকল্প কোন ব্যবস্থায় কাজ করা হবে কিনা জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, দুই মাসের বেশি হলে কিছু সমস্যা হবে। চুক্তি যাদের সঙ্গে তারা বিকল্প কোথা থেকে দেবে। মাসদুয়েকের মধ্যে অসুবিধা হবে না।

বিভ্রান্ত হবেন না
করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া নানারকম তথ্যে বিভ্রান্ত না হতে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিষয়টি আইইডিসিআরের নজরে এসেছে। ভাইরাসটির সার্বিক অবস্থা নিয়ে প্রতিদিন আপডেট তথ্য সরবরাহ করে যাচ্ছে আইইডিসিআর।

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, চীন থেকে ফেরা বাংলাদেশী নাগরিকদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪ জনের নমুনা নেয়া হয়েছে। ৩ জন আইসোলেশনে আছেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। এর মধ্যে দুই জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এছাড়া সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল-সিএমএইচে কোয়ারেন্টাইনে আছেন ১১ জন।

আরও সতর্ক বিমানবন্দর
করোনা ভাইরাসে ভয়াবহতা বাড়ায় আরও সতর্ক হয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখনাকার স্বাস্থ্য সেবার তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে। গত ১৭ দিনে এ পর্যন্ত চীন থেকে মোট ৭ হাজার ৩৩১ যাত্রী দেশে ফিরেছেন। বুধবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, শুধু চীন নয়, সব যাত্রীকেই থার্মাল স্ক্যানারের মধ্যে দিয়ে স্ক্রীনিং করে পার হতে হচ্ছে। যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এজন্য চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যাত্রীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অতিরিক্ত আরও দশ চিকিৎসককে পদায়ন দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ নিয়ে বিমানবন্দরে পদায়নকৃত চিকিৎসকের সংখ্যা দাঁড়াল ২০ জনে। ফলে এখন থেকে প্রতি বেলায় কমপক্ষে তিনজন করে চিকিৎসক সর্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। কোন যাত্রীর গায়ে জ্বর ও শরীর খারাপ শুনলেই চিকিৎসকরা তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেবেন।

এদিকে আশকোনা হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে রাখা বাংলাদেশী ৩১০ শিক্ষার্থীর সেবা যত্ন বাড়ানো হয়েছে। তাদের সর্বক্ষণিক সুবিধা অসুবিধার দেখভাল করতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সবাই আগের মতোই সুস্থ আছেন। সবার দেহের তাপমাত্রাও স্বাভাবিক রয়েছে। তবে অভিভাবকরা জানিয়েছেন, এত কিছুর পরও তারা আর ক্যাম্পে থাকতে চাইছেন না। দ্রুত বাসায় ফিরতে উদগ্রীব হয়ে আছে। প্রতিনিয়ত চিকিৎসক ও নার্স তাদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।

ফিরতে চান বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে আরও ১৭২ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী চীন থেকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের কারণে সেখানে অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাতে কাটাতে ঘরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে পড়েছেন তারা। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের কাছেই ইচাং শহরে অবস্থান করছেন তারা। উহান শহরেই সর্বপ্রথম করোনা ভাইরাস দেখা দেয়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে চীনের উহান থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটে সর্বমোট ৩১২ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ২৯৭ জন, এক বছরের বেশি বয়সী ১২ জন ও এক বছরের নিচে তিনজন রয়েছে। তাদের মধ্যে আট জনের শরীরে জ্বর ছিল। তাই তাদের কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাদের নমুনা পরীক্ষা করে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

বাকিদের রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনা হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইন অবস্থায় রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি থাকাদেরও আশকোনা ক্যাম্পে নেয়া হয়েছে। স¤প্রতি মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা চীনে অবস্থানকারী বাংলাদেশী নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে চাই। তবে বিমানের অভাবে এটি কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা চেষ্টা করছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের ফিরিয়ে আনা হবে।

করোনার প্রভাব দেশের বাজারে
চীনে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশটির অর্থনীতি। থমকে গেছে উৎপাদন ও রপ্তানি। এমন অবস্থায় দেশটির অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশের বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ শিল্পপণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় বাজার হলো চীন। দেশটি থেকে অনেক খাদ্যপণ্যও আসে দেশের বাজারে। পরিস্থিতির আরো সঙ্কটাপন্ন হলে বাংলাদেশের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন। ইতোমধ্যেই দেশের বাজারে চীন থেকে আমদানিনির্ভর আদা ও রসুনের কেজি ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

হু হু করে বাড়ছে মাস্কের দাম। এর পাশাপাশি পোশাক, চামড়া ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতেও প্রভাব পড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল ও পায়রাবন্দরসহ বড় বড় অবকাঠামো খাতে কাজ করছেন চীনের নাগরিকরা। এসব প্রকল্পে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে। তবে দেশের অর্থনীতিতে এখনই এই ভাইরাসের কোন ক্ষতিকারক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এ বিষয়ে শুরু থেকে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

চীন থেকে আর কাউকে আনা হবে না
চীন থেকে আর কোনো বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত আনা হবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। তবে কেউ অসুস্থ হলে সে দেশেই চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেন মন্ত্রী।

চীনে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দেশে ফিরতে নিরুৎসাহিত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আত্মীয়স্বজন ও দেশের স্বার্থে উহানসহ চীনের করোনা ভাইরাস আক্রান্ত এলাকায় থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফিরতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চীন থেকে ১৭০ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরতে চায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। চীনে যারা আছেন তারা কোয়ারেন্টাইনে আছে। সেখানে অসুস্থ হলে চিকিৎসা ভাল হবে। তাই সেখানে থাকাটা অনেক বেটার হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩০ বার

[hupso]