শিরোনাম :

» রাজনীতিকে পুঁজি করে সম্পদের পাহাড় গড়া হাতে গোনা কয়েকজন সুযোগসন্ধানী র‌্যাবের জালে আটক

প্রকাশিত: ২৫. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | মঙ্গলবার

রাজনীতিকে পুঁজি করে সম্পদের পাহাড় গড়া হাতে  গোনা কয়েকজন সুযোগসন্ধানী এরই মধ্যে র‌্যাবের জালে আটক হয়েছে। আরও কতজন কত টাকার পাহাড় গড়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে সাধারণ জনমনে। তবে ক্যাসিনোর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকলে উদ্ধার করা যাবে টাকা আর তাদের মুখোশ উন্মোচন হবে জাতির সামনে।

ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার গেন্ডারিয়া আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়ার পুরান ঢাকার বাসা থেকে গতকাল নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকা, ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআর, প্রায় এক কেজি ওজনের স্বর্ণালঙ্কারসহ বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা জব্দ করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে র‌্যাব-৩-এর একটি দল সোমবার রাত সাড়ে ১২টায় পুরান ঢাকার ১১৯ লালমোহন সাহা স্ট্রিটে অভিযান শুরু করে। ছয়তলা বাড়ির নিচতলায় র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে এ অভিযান শুরু হয়। অভিযান শেষে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল রাকিবুল হাসান।

তিনি বলেন, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দুর্নীতিবিরোধী যে অভিযান শুরু হয়েছিল তার অংশ হিসেবে সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে এই বাড়িতে আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করি। অভিযান শেষে জব্দকৃত টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশী মুদ্রার ফিরিস্তি তুলে ধরে র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল রাকিবুল হাসান বলেন, ‘বাসাটি থেকে নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআর, প্রায় এক কেজি ওজনের স্বর্ণালঙ্কার, ৯ হাজার ৩০০ ইউএস ডলার, ১৭৪ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, ৫ হাজার ৩৫০ ইন্ডিয়ান রুপি, এক হাজার ১৯৫ চাইনিজ ইয়েন, ১১ হাজার ৫৬০ থাই বাথ ও ১০০ দিরহাম জব্দ করা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া গ্রহণ এসব দেশী-বিদেশী মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার থানায় হস্তান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হবে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পরিচালক এনু ছিলেন গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। আর তার ভাই রুপন ছিলেন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কয়েকটি ক্লাবের সঙ্গে ওয়ান্ডারার্সে অভিযান চালিয়ে জুয়ার সরঞ্জাম, কয়েক লাখ টাকা ও মদ উদ্ধার করে র‌্যাব।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর গেন্ডারিয়ায় প্রথমে এনু ও রুপনের বাড়িতে এবং পরে তাদের এক কর্মচারী ও তাদের এক বন্ধুর বাসায় অভিযান চালিয়ে পাঁচটি সিন্দুক ভর্তি প্রায় ৫ কোটি টাকা, আট কেজি সোনা এবং ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় একটি ভবন থেকে এক সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হন এনু-রুপন দুই ভাই। ওই ঘটনার পর মোট সাতটি মামলা করা হয়, যার মধ্যে অবৈধ ক্যাসিনো ও জুয়া পরিচালনা এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে চারটি মামলার তদন্ত করছে সিআইডি।

এদিকে ২৩ ফেব্রুয়ারি যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার বিপুল সম্পত্তির খোঁজ পায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এরপর  র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক শাফি উল্লাহ বুলবুল জানান আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সংগতি নেই শামীমা নূরের ।

হোটেল ওয়েস্টিনে তাঁদের নামে বুকিং দেওয়া বিলাসবহুল প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইট এবং ইন্দিরা রোডের ফ্ল্যাট থেকে র‌্যাব ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা উদ্ধার করেছে। এর বাইরেও উদ্ধার হয়েছে একটি বিদেশী পিস্তল, দুটি পিস্তলের ম্যাগজিন, পিস্তলের ২০টি গুলি, পাঁচ বোতল দামি বিদেশী মদ, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেকবই, কিছু বিদেশী মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা ও এটিএম কার্ড।

নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া। বাবা ছিলেন অটো গ্যারেজের মালিক। এক সময় তেমন কিছুই ছিল না তাদের। কিন্তু গত পাঁচ বছরে অর্থবিত্ত অর্জন করে আঙুল ফুলে গলা গাছ বনে গেছেন। গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট কিনে হয়েছেন শত কোটি টাকার মালিক। এদিকে ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমনের উত্থান শুরু। শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ব্ল্যাকমেইল ছিল সুমনের প্রধান পেশা। দূরদর্শী, চতুর ও মাস্টারমাইন্ড সুমন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। ২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার পর তিনি আলোচনায় আসেন। এরই মধ্যে পাপিয়া চৌধুরীকে বিয়ে করেন সুমন। এরপর তার স্ত্রী পাপিয়াকে রাজনীতিতে কাজে লাগান।

এরই মধ্যে পাপিয়া ও সুমনের অস্বাভাবিক উত্থান হয়। ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে তৌহিদা সরকার রুনা সভাপতি ও পাপিয়া চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুরু হয় অস্বাভাবিক উত্থান। এ সবই করেছেন রাজধানী ঢাকায় বসে। মাঝে মধ্যেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের মিটিং মিছিলে যোগ দেন দলবল নিয়ে।

নরসিংদী জেলা শহরে বাগদী মারকাজ মসজিদ এলাকায় দোতলা বিশিষ্ট বাড়ি রয়েছে পাপিয়ার। সম্প্রতি পৌর শহরের ব্রাহ্মন্দী এলাকায় তার স্বামী মতি সুমন বিলাশবহুল ছয়তলা বাড়ি করেছেন। বিলাদী মোড়ে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ১০ শতাংশ এবং আরেকটি ৬ শতাংশের দুটি প্লট রয়েছে। তার শ্বশুরবাড়ি ব্রাহ্মন্দীতে স্বামীর দোতলা একটি বাড়ি আছে। রাজধানীর ফার্মগেট ইন্দিরা রোডে ‘রওশন ডমিনো রিলিভ’ বিলাসবহুল ভবনে তার ও তার স্বামীর নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া তার কালো ও সাদা রঙের দুটি মাইক্রোবাস, একটি হ্যারিয়ার, একটি নোয়া ও একটি ডিজেল কার আছে।  র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক শাফি উল্লাহ বুলবুল জানান, গত বছরের ১২ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে শামীমা-মফিজুর দম্পতি ওয়েস্টিনের কয়েকটি বিলাসবহুল কক্ষে অবস্থান করেন। এ জন্য তাঁরা পরিশোধ করেন ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ টাকা ৩১ পয়সা। এই অর্থের উৎস কী, সে ব্যাপারে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি তাঁরা। হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা বিভিন্ন হোটেলে নারীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করার অভিযোগ আছে শামীমার বিরুদ্ধে।

ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট (ক্যাসিনো সম্রাট) 
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের সংগঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ২০০৩ সালে নির্বাচিত হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে। মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি হন ২০১২ সালে। এরপর আর তার পেছনে তাকাতে হয়নি। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে জুয়া খেলা ছাড়াও চাঁদাবাজি, টেন্ডার, বাড়ি ও জমি দখল করে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি। মামলায় সম্রাটের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৯৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলেও দেশের বাইরে নামে-বেনামে অন্তত ১০০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় দুদকের মামলায়। এ সম্পদ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই ও আমেরিকায়।

জি কে শামীম 
র‌্যাবের অভিযানে আটক যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম (জি কে শামীম) ২৯৭ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য জানায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ‘শুদ্ধি অভিযানে’ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন জি কে শামীম। দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন জি কে শামীমের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ করবর্ষে জি কে শামীম ৫০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। কিন্তু আয়কর রিটার্নে তিনি তাঁর স্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন ৪০ কোটি ২১ লাখ ৪০ হাজার ৭৪৪ টাকা। অনুসন্ধানের সময় পাওয়া রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দুদক তাঁর আরও ৫০ কোটি টাকা অর্জনের বৈধ উৎস খুঁজে পায়নি। একই করবর্ষে তিনি আয়কর নথিতে অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য দেখিয়েছেন ৩৮ কোটি ৬৮ লাখ ১ হাজার ৮৯ টাকা। কিন্তু কোম্পানিতে বিনিয়োগ, এফডিআর ও গাড়ি কেনা বাবদ ৩৬ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৭১৯ টাকার কোনো বৈধ উৎস পায়নি দুদক। কাগজপত্র অনুযায়ী জি কে শামীমের মা আয়েশা আক্তার জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানির ২০ শতাংশের মালিক। অথচ তাঁর আয়ের কোনো উৎস নেই। জি কে শামীমকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁর অফিসে অভিযান চালিয়ে তাঁর মায়ের নামে ১৬৫ কোটি ২৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকার এফডিআরের কাগজপত্র জব্দ করা হয়। এ ছাড়া শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চলার সময় ১ কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং ৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকার সমপরিমাণ মার্কিন ডলারও জব্দ করে র‌্যাব। ওই টাকারও কোনো উৎস পায়নি দুদক। সব মিলিয়ে জি কে শামীমের ২৯৭ কোটি ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫১ টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।

খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া
ভূমি দখল, টেন্ডারবাজি ও ক্যাসিনো ব্যবসা হতে শুরু করে চাঁদাবাজিসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডে গডফাদার হিসাবে নাম উঠে আসে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার।
কুমিল্লায় জন্ম নেয়া শান্তিনগরের হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করেছেন খালেদ। ওই সময় কলেজে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে পুলিশের সঙ্গে তার সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের গুলিতে তার একটি পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই থেকেই তার নাম হয় ল্যাংড়া খালেদ। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম মানিক ও ফ্রিডম রাসু নামে দুই নেতার হাত ধরেই খালেদের উত্থান। ২০১২ সালের পর ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ছত্রছায়ায় ঢাকার একটি অংশের পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে আসে খালেদের হাতে। আর এলাকায় নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সর্বোচ্চ শক্তির ব্যবহার শুরু করেন তিনি।

রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকায় কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করতেন খালেদ। এর মধ্যে ১৬টি ক্লাব নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়ংমেনস নামের ক্লাবটি সরাসরি তিনি পরিচালনা করতেন। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ১ লাখ টাকা নিতেন তিনি। র‌্যাবের অভিযানে ক্যাসিনোতে মদ আর জুয়ার বিপুল সরঞ্জামের পাশাপাশি প্রায় ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২৯৯ বার

[hupso]