» মফস্বলের সাংবাদিকতা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ

প্রকাশিত: ১২. মার্চ. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

মফস্বলের প্রত্যেকটা সাংবাদিক নিজ নিজ এলাকায় পরিচিত। সবাই সবাইকে চেনেন এবং জানেন। মফস্বলের কোন সংবাদ কারও বিপক্ষে গেলে, সাংবাদিককে টার্গেট করা খুব সহজ।

সংবাদ বিপক্ষে গেলেই হতে হয় মামলা-হামলার শিকার। রাজধানী ঢাকায় সেটা সম্ভব না। তাই মফস্বলের সাংবাদিককে প্রতি মুহুর্তে, প্রতিদিনই ঝুঁকির মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়।

বেশ কিছু অঞ্চল আছে যেখানে সাংবাদিকতা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ঝুঁকি তৈরি হয় নানা দিক থেকে। এর মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল খুলনা, বরিশাল, যশোর, কুষ্টিয়া ও উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রংপুর জেলা অন্যতম।

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, সরকারি প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীনরা বিভিন্ন সময় মফস্বল সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে।

পাশাপাশি মফস্বলে একজন সাংবাদিক তার পেশাগত কারণে যখন কোন প্রতিকূলতার মাঝে পড়ে তখন তার নিয়োগকারী সংবাদমাধ্যম তাকে সহায়তার জন্য কতটা এগিয়ে আসে সেটি এখন বড় প্রশ্ন?

কিছু বড় পত্রিকা আছে, যাদের মফস্বল সাংবাদিকরা সমস্যায় পড়লে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ পাশে এসে দাঁড়ান। মামলায় পড়লে কর্তৃপক্ষ সেটা দেখেন এবং সহযোগিতা করেন। কিন্তু মফস্বল সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিপদে পড়লে দেশের অধিকাংশ পত্রিকা কোন সহযোগিতা করেননা।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপের সংঘাতের সময় ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন সিরাজগঞ্জের সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল। হঠাৎ করে একটা গুলি এসে জীবন কেড়ে নেবে, এমনটা হয়তো তিনি কখনোই ভাবেননি।

তাকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল কি না সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় মফস্বলে সাংবাদিকদের টার্গেট করে হত্যা এবং নির্যাতন প্রায়ই ঘটে।

ফেনীর টিপু সুলতানের কথা অনেকেরই হয়তো এখনো মনে আছে। হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল সেটি বেশ বিরল।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের এমপি জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে ছিল মূল অভিযোগ টিপু সুলতানের। তার পর থেকে ফেনীতে আর সাংবাদিকতা করা হয়নি টিপু সুলতানের । নিজ জেলা ছেড়ে এখন তিনি ঢাকায় সাংবাদিকতা করছেন।

যশোরের সাংবাদিক সাজেদ রহমানের বড় ভাই শামসুর রহমানকে ১৭ বছর আগে তার অফিসে গুলি করে হত্যা করা হয়। সাজেদ রহমানও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করছেন।

জেলা পর্যায়ে যেসব সাংবাদিকরা কাজ করছেন, তাদের অনেককেই প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে কোন নিয়োগপত্র দেয়া হয়না । অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম মফস্বল সাংবাদিক/জেলা প্রতিনিধিদের কোনও মাসিক বেতনও দেন না।

অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতনের নিশ্চয়তা না থাকলেও খবর ও বিজ্ঞাপন পাঠানোর চাপ ঠিকই থাকছে মফস্বল সাংবাদিকদের উপর।

ফলে খবরের পেছনে যখন সাংবাদিক ছুটছেন তখন অনেক সময় নিজের নিরাপত্তার দিকে নজর দেবার সুযোগ থাকে না তাদের। তাদের পরিস্থিতি মোকাবেলার কোন প্রশিক্ষণও নেই।

অনেক জায়গায় রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের মাঝেও রয়েছে তীব্র বিভেদ। অনেক জেলায় রাজনৈতিক বিভেদের কারণে গড়ে উঠেছে একাধিক সাংবাদিক সংগঠন বা প্রেসক্লাব।

রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে মফস্বলের সাংবাদিক সংগঠনগুলো নিজেদের অধিকার রক্ষায় সফল হতে পারছেনা।

এসব কারণে অনেক সাংবাদিক সাংবাদিকতার বাইরেও অন্য ক্ষেত্রে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে। ফলে তাদের সাংবাদিকতা কাজের ঝুঁকিও বাড়ছে।

বিজ্ঞজনরা মনে করেন, যেসব জায়গায় বা পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা সহিংসতা কিংবা অন্যকোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন, সেসব জায়গায় সাংবাদিকদের নিজস্ব কিছু প্রস্তুতি থাকা উচিত।

একজন মফস্বল সাংবাদিক হয়তো লেখার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, কিন্তু পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে এবং কীভাবে ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে হবে, সে প্রশিক্ষণ তার নেয়া দরকার।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং অনলাইনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়লেও মফস্বল সাংবাদিকদের স্বার্থ উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

শীঘ্রই পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হবে–এমন আশাও করছেন না মফস্বল সাংবাদিকরা।

(সাংবাদিক ফয়সাল আজম অপু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ)

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৬৪ বার

[hupso]