প্রত্নতত্ত্ব  বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই স্থাপনাগুলো আনুমানিক ৯ম থেকে ১১ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের। এই স্থানটি কেশবপুরের আরেক প্রসিদ্ধ প্রত্নতত্ত্ব  ভরত ভায়না বৌদ্ধ মন্দির থেকে আনুমানিক ১.৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। চারপাশের ভূমি হতে ঢিবির পূর্ব অংশ প্রায় ২.৫ মিটার উচুঁ।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ ভারতের পশ্চিমবাংলা সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলে এমন স্থাপনা আবিষ্কৃত হলো এই প্রথম । তাদের মতে, এই স্থাপনাগুলোর এমন কিছু অনন্য ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বদিকে ইতোপূর্বে আবিষ্কৃত অন্যান্য বৌদ্ধবিহারগুলোর থেকে, আলাদা।
প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্যিক এই বৈশিষ্ট্যাবলির বিবেচনায় এই ‘বৌদ্ধ বিহার-মন্দির কমপ্লেক্স’-এর ধ্বংসাবশেষ, বাংলাদেশ ও ভারতের বিহার, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবাংলার সমসাময়িক অন্যান্য বৌদ্ধস্থাপনা থেকে সম্পুর্ণ আলাদা।
দক্ষিণ  এশিয়ার অন্যান্য অংশে এমন বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পন্ন বৌদ্ধ স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেছে কীনা,  বিশেষজ্ঞগণ এখন তা  জানার  চেষ্টা করছেন।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব মো. হান্নান মিয়া জানান, এই  বৌদ্ধবিহার-মন্দির’ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মানব বসতির বিস্তার ও পরিবর্তন এবং ইতিহাসের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা ও বরিশাল বিভাগের একটি খনন দল এ বছরের ২২ জানুয়ারি থেকে কেশবপুর উপজেলার গৌরিঘোনা ইউনিয়নের কাশিমপুর মৌজার ডালিঝাড়াস্থ ঢিবিতে খনন শুরু করে। সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে এগুলে এ (মার্চ) মাসেই খনন কাজ শেষ হবে।
এ পর্যন্ত খনন করে যা পাওয়া গেছে, তাতে মনে হচ্ছে,  স্থাপনাটির সামগ্রিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাংশের অন্যান্য বৌদ্ধ বিহার/মহাবিহারগুলোর মূল স্থাপত্যিক পরিকল্পনা অনুসৃত হয়েছে। বিহারের তিনদিকে ভিক্ষুকক্ষ ও একদিকে মন্দিরসহ একটি আয়তাকার পরিকল্পনা অনুসৃত হয়েছে। উত্তর দিকের ভিক্ষুকক্ষসহ বাহুটি এখনো উন্মোচিত হয়নি। মাঝখানে রয়েছে বিহারের অঙ্গন।
খননকালে প্রাপ্ত মৃৎপাত্র এবং স্থাপত্য শৈলিগত বিবেচনায়- এই বিহারটির সময়কাল আনুমানিক ৯ম থেকে ১১শ শতক।
খননকাজে নিয়োজিতরা জানান, ভিক্ষু কক্ষগুলোর প্রবেশদ্বারের  দিকে পাশাপাশি পিছনেও একটি প্রশস্ত বারান্দা বা বারান্দা সদৃশ পরিসর রয়েছে। এই বারান্দা দু’টো ভিক্ষুকক্ষগুলোকে পৃথককারী পরিসরদ্বারা যুক্ত এবং উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোণার মেঝের সাথে যুক্ত। বিহারটির পূর্ব বাহুতে কোনো ভিক্ষুকক্ষ নেই। এখানে দু’টি সেলুলার স্থাপনারীতিতে নির্মিত মন্দির রয়েছে।
বিহারের স্থাপনাটি আকারের প্রতিসমতা ও গঠন আমলে নিলে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আরেকটি মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল বলে অনুমান করা যায়। তবে স্থানীয় মানুষজন বাড়ি নির্মাণ করে এই মন্দিরটির উপরের কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছে।
প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর “বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ” গ্রন্থে বলেছেন, ভরতভায়না থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণে  গৌরিঘোনা গ্রামে এককালে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ ছিলো।
স্থানীয় লোকজন এ স্থানকে ভরত রাজার বাড়ি বলে মনে করেন। তার মতে, বহু প্রাচীন কালে ঐ স্থানে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র ছিল।  গৌরীঘোনা গ্রামের ধ্বংসাবশেষগুলিও ছিল খুব সম্ভব কোন বৌদ্ধবিহার বা স্তুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এটা  কোন রাজবাড়ি ছিল না।
পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার চন্দ্রকেতুগড়ে ও বেড়াচাম্পায় খননের ফলে মৌর্য যুগের বহু কীর্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। ভরতভায়না থেকে ঐ সব স্থানের দূরত্ব হবে ৬৪ কিলোমিটার। ভরতভায়না, আগ্রা-কপিলমুনি, আমাদি প্রভৃতি স্থানের ধ্বংসাবশেষগুলিও সে কালের এবং সে সব কীর্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া বিচিত্র নয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বৌদ্ধ বিহারটি আয়তাকার। পূর্বদিকে ২টি মন্দির,  উত্তরবাহুতে  ২টি কক্ষ, দক্ষিণ বাহুতে ৯ টি ভিক্ষুকক্ষ ও পশ্চিম বাহুতে ৭ টি ভিক্ষুকক্ষ রয়েছে। উভয় মন্দিরই, আবদ্ধ কক্ষ তৈরি করে তার মাঝে নির্মিত হয়েছে। এই ধরনের স্থাপনারীতি সেলুলার স্থাপনারীতি হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের নিকটবর্তী ভরতভয়না, মনিরামপুরের দমদম পীরস্থান ঢিবি ও ডালিঝাড়া ঢিবিতে উন্মোচিত স্থাপত্যকাঠামোতেও একই রীতি লক্ষ্যণীয়।
ডালিঝাড়া বৌদ্ধবিহার খনন সম্পর্কে প্রত্নতত্ত্ব  অধিদপ্তরের আঞ্চলিক খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, গত ২২ জানুয়ারি  থেকে  সেখানে প্রত্নতত্ত্ব খনন শুরু হয়েছে। খননের ফলে আনুমানিক ৯ম-১১শ শতকের একটি বৌদ্ধ বিহার উন্মোচিত হয়েছে।
বিহারের পূর্বদিকে দু’টো বৌদ্ধ মন্দির এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে টানা বারান্দা, ভেতরের ও বাইরের দিকে দেওয়ালসহ সর্বমোট ১৮টি কক্ষ উন্মোচিত হয়েছে। বিস্তৃত খনন করা সম্ভব হলে আরো স্থাপত্যিক কাঠামো পাওয়া যেতে পারে।
প্রখ্যাত ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক ড. অরুণ নাগ এ সম্পর্কে বলেছেন,  বাংলাদেশের যশোর জেলার কেশবপুরের ডালিঝাড়া ঢিবিতে যে খননকার্য চালানো হয়েছে, তার আলোকচিত্র, ভূমি-নকশা ইত্যাদি দেখে আমার দৃঢ় ধারণা, এটি একটি বৌদ্ধ বিহার, যার আনুমানিক সময়কাল খ্রিস্ট্রীয় নবম-দশম শতক। দুটি কারণে এই আবিষ্কারটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ, দক্ষিণ বঙ্গে ভরত ভায়নার পর এটি দ্বিতীয় বৌদ্ধ বিহার যা আবিষ্কৃত হলো।
এই স্থাপত্যটির কয়েকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশের কোথাও দেখা যায়নি। আমি মনে করি, সমগ্র স্থাপত্যটি উম্মোচিত হলে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ঘটবে” ।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব হান্নান মিয়া বলেন, যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার গৌরিঘোনা ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামের ডালিঝাড়া ঢিবিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বৌদ্ধ স্থাপনাটি মুজিববর্ষে আমাদের অন্যতম অর্জন। প্রাচীন এ নিদর্শনটির বিস্তৃত খনন ও সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।