» চলুন ঘুরে আসুন দেশের সর্ববৃহৎ বধ্যভূমি

প্রকাশিত: ১৪. ডিসেম্বর. ২০১৯ | শনিবার

বেত্রাবতী ডেস্ক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হল থেকে পূর্বদিকে তাকালে প্রায় আধা মাইল দূরে ইট দিয়ে তৈরী একটি স্তম্ভ দেখা যাবে। দেখতে সাদামাটা গড়নের হলেও এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনেক নিগূঢ়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চূড়ান্ত বিজয় লাভের পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের দ্বারা নৃশংসভাবে হত্যা, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য নিরীহ বাঙালি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ বধ্যভূমি বা গণকবর সেই পৈশাচিকতার সাক্ষ্য বহন করে।

১৯৭১ সালে অগণিত নিরপরাধ মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়েছিল স্থানটিতে। সেই নির্মমতার করুণ ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে জানান দিতে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভটি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়র শহীদ শামসুজ্জোহা হলকে প্রায় ৯ মাস ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। এসময় রাজশাহীসহ পাশ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে শতশত নিরপরাধ মানুষকে এখানে ধরে নিয়ে এসে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই গণকবরে পাকিস্তানী সেনারা অসংখ্য নারী-পুরুষকে হত্যা করে ফেলে রাখে।

১৯৭২ সালের ২৩ এপ্রির আবিষ্কৃত হয় একটি গণকবর। কবর খননে পাওয়া যায় সহস্য মানুষের মাথার খুলি-নরকঙ্কাল। শহীদদের স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মীদের দ্বারা সেখানে নির্মিত হয় বধ্যভূমি।

শহীদ শামসুজ্জোহা হলের আধা মাইল পূর্বে প্রায় ১ একর এলাকা জুড়ে নির্মিত স্তম্ভটি ক্ষত-বিক্ষত বাংলাদেশের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর গণকবরের স্থানে একটি স্মৃতিফলক উন্মোচন করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে রাতের আধাঁরে ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা স্মৃতিফলকটি ভেঙে ফেলে।

পুনরায় এ স্থানে ১৯৯৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর এম সাইদুর রহমান খান স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন। পরে ২০০২ সালে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী রেদোয়ান আহমদ।

২০০৪ সালে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক  রেজাউল করিম।

বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভটি সমতল ভূমি থেকে কংক্রিটের বেদি তৈরি করা হয়েছে। বেদিটির ঠিক মাঝখানে কংক্রিটের বড় একটা কূপ। কূপের মাঝখানে দন্ডায়মান ৩১ ফুট উঁচু এবং ৬ স্তম্ভবিশিষ্ট একটি স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। স্তম্ভের সামনে রয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ।

গোলাকৃতি একটি চৌবাচ্চাকে ভেদ করে চৌকোণাকৃতি স্তম্ভটি কয়েকটি ধাপে উপরের দিকে উঠে তুলনামূলকভাবে সরু হয়ে গেছে। স্তম্ভে চৌকোণাকৃতি ইটের দেয়াল ভেঙে এবড়ো-থেবড়োভাবে গড়া। দেখে মনে হয় গুলির আঘাতে দেয়ালের বুকে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। স্তম্ভ¢টির গায়ে রয়েছে কালো কালো দাগ, যেটা শহীদদের রক্ত শুকানো দাগের প্রতীক। অপর দিকে কূপটাকে মৃত্যু কূপের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

এ বধ্যভূমি দেখলেই অনুভব করা যায় কি নির্মমতা ঘটেছিল সেসময়। এটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর দ্বারা বাঙালিদের নির্মম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হত্যার স্মৃতি ধারণ করেছে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতার সাক্ষ্য হয়ে দাড়িঁয়ে রয়েছে এ স্মৃতিস্তম্ভ।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনযোগে রাজশাহী যেতে পারেন। ঢাকার কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পরিবহনের বাস ছাড়ে। সেখান থেকে বাসেও পৌঁছাতে পারেন রাজশাহী।রাজশাহী নামার পর অটো বা রিক্সাযোগে সরাসরি চলে যেতে পারেন বধ্যভূমি। ঢাকা থেকে রাজশাহীতে ট্রেন ও বাসের ভাড়া যথাক্রমে ৩৫০ টাকা ও ৪৮০ টাকা।

কোথায় থাকবেন
রাজশাহীতে থাকার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। মহানগরীর জিরো পয়েন্ট, রেলগেট, লক্ষ্মীপুর, সিএন্ডবি মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল। এসব হোটেলে ৭০০-৩০০০ টাকায় কক্ষ ভাড়া পাওয়া যাবে।

কোথায় খাবেন
মহানগরীর জিরো পয়েন্ট, রেলগেট, লক্ষ্মীপুর, সিএন্ডবি মোড়ে উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ সংলগ্ন খাবারের দোকানেও খেতে পারেন।

 

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯০ বার

[hupso]